বুধবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৩

Posted by এম.জামান |
ভেবে দেখেছেন কি দিন দিন ভাল মানুষের সংখ্যা হাতের পাঁচ আঙুলের কড়ে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেন? কারনগুলো যে আমরাই আর আমাদের নিত্যদিনকার আচার-আচরণ, তাই জেনে অবাক হবার কিছুটি নেই। দেখুন না আজকাল এর মুখে ওর মুখে রসগোল্লার চেয়েও রসাল স্বাদের গল্প কেমন ছোটাছুটি করে বেড়ায় জানিসতো ওমুক না পাক্কা ঘুষখোর, ঐ লোকটা তো আস্ত বদমাশ, শয়তানের হাড়, অথবা বলি কিপটুসের বাসা। জেনে অথবা না জেনেই এই অভ্যেসটা আমরা দারুণভাবে রপ্ত করে ফেলেছি। আড্ডায়, চায়ের আসরে কি ফোনে, চ্যাটিংয়ে সর্বক্ষেত্রেই কেবল এর নিন্দে ওর বদনাম। এছাড়া যেন আমাদের চলেই না। গল্পের সাথে সাথে পরনিন্দের সস না মেশালে আমাদের মজাই লাগেনা কিছুতে। এতে করে আমার আর আপনার ক্ষতিটা কোথায় হচ্ছে জানলে রীতিমত আঁতকে উঠবেন।

পরিবারে, সমাজে বড়রা যা কিছু করে ছোটরা তাই দেখে তাই করে এবং তাই ওদের ব্যাক্তিত্ব বিকাশে প্রভাবিত করে। আমরা বড়রা অনেক ভুল অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে শিশুদের নিয়ে যাচ্ছি। যার ফলাফল কিন্তু সকলকেই ভোগ করতে হচ্ছে এবং হবে। শুধুমাত্র তাই নয় আমরা শিক্ষিত-অশিক্ষিতি সকলেই চরম মাত্রার একটি ভুল কাজ করে চলেছি, আর তা হোল বাচ্চাদের সামনেই আমরা এমন সব টিভি নাটক, সিনেমা অথবা গান দেখে থাকি যা কি না তাদের আনকোরা মস্তিস্কে ও মননে চিরতরে গেঁথে যাচ্ছে। ছোটরা না পারছে আমাদের কাছ হতে কিছু শিখতে, না পারছে টিভি থেকে কিছু নিতে । ওদের কাছে ভালো মানুষ হবার না আছে ভাষা, না আছে অসাধারণ কোন গল্প, না আছে কোন বিদ্যে।

সত্যিকার অর্থে ভাল মানুষ আসলে কি?

যে সর্বদা সৎ পথে চলে, ভাল আচরণ করে, অন্যায় থেকে নিজেকে রক্ষা করে এবং কারোর খারাপ করেও না, চায়ও না; তাকেই সোজা কথায় ভালো মানুষ বলি আমরা। ধর্মগ্রন্থগুলোতেও তো এই কথাই লেখা আছেঝ তাই না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লাম, পুঁজো দিলাম, দরগায় গেলাম সিন্নি দিলাম আর আমি ভালো মানুষ হয়ে গেলাম। তা হলে তো গুনে শেষ করা যেত না ভালো মানুষের সংখ্যা। এত আর হাহুতাশ করতে হতো না কাউকে ভালো মানুষ কি আর আছে দুনিয়ায়? সে যা হোক, আমি ভাবতাম বুঝি শহুরে মানুষদের চাইতে গ্রামের মানুষগুলি বোধহয় ভালো আছে। অন্তত সেখানকার বাচ্চারা ভালো মানুষ হবার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু কি জানেন, আমায় পুরোপুরি হতাশ হতে হয়েছে গ্রামের মানুষদের কাছেও। এ বছরই জানুয়ারীর মাঝামাঝি সময়ে গ্রামে গিয়েছিলাম বেড়াতে। সে এক অজপাড়া গাঁ। জেলা শহর ছাড়িয়ে থানা শহর। সেই থানা হতেও আরও আরও গভীরের এক গ্রাম।

ভেবেছিলাম কদিন গ্রামের পরিবেশে মন শরীরকে চনমনে করে তুলব, বিশুদ্ধ করে তুলবো চিন্তা-চেতনাকে। কিন্তু কোথাইবা গেল সেই বৃন্দাবন আর কৈ গেল সেই রাধা! গ্রাম যে গ্রাম আর নাই হয়ে গেছে শহুরে অ্যাকুরিয়াম। তাই দেখে-শুনে মন ভার হয়ে গিয়েছিল আমার. পিঠে বানানোর সকাল, মুড়িমাখা বিকেল, রুপকথার রাত সঅব যেন দুম করে উধাও হয়ে গেছে। হাওয়ায় যেন মিলিয়ে গেছে গ্রামরে মানুষের মুখের সহজ-সরল হাসিটুকু। উধাও হয়ে যাওয়ার জন্যে যে দুষ্টু ডাইনী বুড়িটা দায়ী তাকেও কিন্তু খুঁজে পেলাম ঐ সব পাড়াগাঁয়ের চালা ঘরেই।কি দারুন উৎসবে দাদী, নানী, চাচা, চাচী, নাতিটা, পুতিটা, ও পাড়ার আব্দুল, তার নয়া বৌ আর সাথে খুদে পানা সব শিশুর দল গোল হয়ে হা মুখে আর চমক লাগা চোখে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে স্টার জলসার নাটক গিলছে। সময় কাটানোর এরচেয়ে ভালো উপকরন আমি তাদের ওখানে আর একটাও দেখিনি। কোন কোন বাড়ির বাচ্চাদের আবার ঘুম হতো না টাপুর-টুপুর বা অলক্ষি না দেখলে। অথচ এই সমস্ত নাটকগুলোর মূল উপজীব্যই হলো কুটকচালী, শয়তানি আর অন্যদিকে চোখের জল! পন্ডিত নয়তো ডালিম কুমারের গল্প শোনাত। কি মধুরই না ছিল গ্রাম। আর এখন বাচ্চারা কি শিখছে দেখুন বোনে বোনে হিংসে করতে হবে, পরচর্চা করতে হবে আর ভাল হলে কাঁদতে হবে। তো এই বাচ্চাদের আমরা কি করে ভালো মানুষ হবার পথ বাতলে দেবো?

অন্যদিকে শহরের বাচ্চারা তো আরও আজব জীবের মত বড় হচ্ছে। বাবা-মা দুজনই সমস্ত দিন নানা কাজে ব্যাস্ত, আর দিন শেষে টিভি নিয়ে হুল্লোর। পড়াশুনা সে তো হচ্ছেই। নামকরা স্কুল, অভিজ্ঞ শিক্ষক, কোচিং সে কি এমনি এমনি। বস্তুত সিলেবাস রপ্ত করে পরীক্ষায় ভালো নম্বর তুলতে তুলতেই আমাদের আমাদের বাচ্চারা রীতিমত হিমশিম খাচ্ছেআর বড়দের মত হবার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারা ভালো মানুষ হবার সুযোগ এবং পরিবেশ কোনটাই পাচ্ছে না। কি গ্রাম কি শহর সবখানেই একই দুরবস্থা।

মনে আছে ছেলেবেলায় বাসা থেকে বের হবার সময় রোজ আম্মু বলে দিতেন, “বাবু রাস্তায় কিছু পড়া থাকলে ধরবে না, কারুর সাথে খারাপ ব্যবহার করবে না, এ্বইভাবে প্রতিদিন মায়েরা-বাবারা, গুরুজনেরা সদুপদেশ দিতেন কিংবা নীতি গল্প শোনাতেন। এখনকার মায়েদের সে সময়ইবা কোথায়?

আমরা বড়রা কেবল বলাবলি আর আলোচনাই করে যাচ্ছি দূর্নীতি আর অসৎ মানুষে দেশটা ভরে যাচ্ছে। কিন্তু আমরাই যে এর জন্য দায়ী, সেটা কি একবারও ভাবি।

আমার আপনার মায়েরা নির্দিষ্ট সময় ছাড়া টিভি খুলতেন না, এমনকি নির্দিষ্ট বিষয় ছাড়া দেখতেও দিতেন না। বড়রা কথা বলার সময় হুশিয়ার থাকতেন যেন ছোটরা শুনতে না পায়। কত সতর্ক আর সচেতন পরিবারই না ছিল তখন।

একটা কথা কিন্তু আমাদের সকলকেই মাথা পেতে নিতে হবে আর তা হলো ভালো পিতা-মাতা, ভালো পরিবার না হলে আমরা না হলে আমরা ভালো মানুষও পা্বনা। আজ যেখানে এই ভালো পরিবারই অদৃশ্য তখন হরদম চেচামেচি করেই কি দূর্নীতি ঠেকাতে পারবো আমরা? বাগানে ফুল না থাকলে মৌমাছিও আসবে না, মধুও পাবনা এটা সকলকেই মনে রাখতে হবে।

জানি আমাদের হাড়মজ্জায় অনিয়ম, দূর্নীতি আর অন্যায় শেকড় দাবিয়ে বসে গেছে। এই আমরা বদলাতে বদলাতে চিতা নইলে কবরের বাসিন্দা হয়ে যাবো। তাই অন্তত আমাদের বাচ্চাদের ভালো মানুষ হয়ে ওঠার পরিবেশ দেই, সুযোগ দেই কেননা তাদের হাতেই তো আগামির পরিবার, সমাজ সর্বোপরি রাষ্ট্র।

প্রতিদিন আর কিছু না হোক সত্যি কথা বলার এবং সত্যকে চিনে নেবার অনুশীলন করাই। এর বেশি কিছু লাগেনা, “ব্যা ব্যা ব্লাক শিপেরউপর ছেড়ে না দিয়ে-
                                          “সদা সত্য কথা বলিবে,
                                                 পরচর্চা মহাপাপ
এগুলোকে গুরুত্ব দিতে শুরু করি। আমরা ঘরেই যে শিশুর তথা মানুষের আদর্শ বিদ্যাপিঠ তা যেন ভুলে না যাই। আমাদের বাচ্চারাই একদিন ভালো মানুষ হয়ে উঠবে। দূর করবে সকল অনাচার।

পরিশেষে একটি ঘটনার কথা বলেই শেষ করবো আমার এই লেখাটি।
ঘরে বসে সমস্ত দিন বই পড়ি নয়তো গান শুনি। গত পড়শু একটা গান শুনছিলাম, যা আমার ভারী পছন্দের-
          এই কথাটা ধরেই রাখিস মুক্তি তোরে পেতেই হবেতো পাশের বাসার এক আপা কাছে এসে বললেন, “এই গানটা আমার কাছে ভালো লাগে, কিন্তু কি বলে ঠিক বুঝতে পারিনাএটা কি কোন দেশকে মুক্ত করার গান?”

আমি তথন তাকে তিন-চার বার গানটা শোনালাম। এবং সহজ ভাষায় তাকে সত্যিকারের মুক্তির কথা বললাম। ততক্ষনে সে কাঁদছে। আমি কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় যাবো না তবে মনে হয় আমাদের রক্ত প্রবাহের মধ্যে মুক্তির দিকে যাবার একটা তাড়া আছে। আমরা সকলে সেই মুক্তির আশায় উন্মুখ হয়ে থাকি। তা সে যে ধরনের মানুষই হই না কেন। কিন্তু আমরা তো বুঝি না আসলে কোনটা মুক্তির পথ আর কিবা আমাদের উদ্দেশ্য। জল থাকতেও আমরা পাকে গড়াগড়ি খাচ্ছি সবাই।

মুক্তি তো আমাদের বিবেকের কাছ থেকে, সমাজের কাছ থেকে, সকল রকমের অন্যায়, অবিচার, অসত্যের কাছ থেকে পেতে হবে। নইলে ঐ মহাবিচারকের কাছে দাঁড়াবো কোন মুখে, কি হাতে? পৃথিবীর সব ধর্মগ্রন্থেই তো সত্য বলার কথা লেখা আছে আসুন না আমরা সত্য বলার সাহস করি, বাচ্চাদের সৎ মানুষ হতে সাহায্য করি। তবেই না ভালো মানুষের সংখ্যা বাড়বে। তবেই না দূর হবে দেশ হতে সকল অনাচার, হিংসে, দলাদলি আর অস্থিরতা।

                          এই কথাটা ধরেই রাখিস মুক্তি তোরে পেতেই হবে
                     যে পথ গেছে পাড়ের পানে সে পথে তোর যেতেই হবে।
                                                     -   রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

0 comments :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন