বুধবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৩

Posted by এম.জামান |


গত ২৪ তারিখ হতে ২৬ তারিখ পর্যন্ত প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁ হোটেলে হয়ে গেলো এক্সপো মালয়শিয়া ২০১২। মালয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বেশ কিছু নৃত্য শিল্পী এসেছিল ওদেশ থেকে এদেশে। অনেকটা দৈবক্রমেই পরিচিত হবার সুযোগ পেলাম ঐ দলটির সাথে। তাদেরই একজন ছিলেন প্রফেসর আমানদাস পল। তাঁর সাথে গোটা দুদিন এবং একদিনের পুরো সন্ধ্যে নানান বিষয় নিয়ে আলোচনার সুযোগ হয়েছে আমার। তিনি একাধারে একজন শিক্ষক, একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের আর্টিস্টিক ডিরেক্টর এবং নৃত্য শিল্পী। মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানেই সে আমার দেশের মানুষ ও শিল্পের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। এই তো গেল আনুষ্ঠানিক কথাবার্তার বিষয়-আশয়, এবার বলবো তার সাথে বন্ধুত্বের আন্তরিকতার কথা।

স্বাভাবিক ভাবেই আমরা খুব দ্রুতই বন্ধু হয়ে গেলাম, সেই সাথে আমাদের স্বপ্ন ও কর্মের চিন্তাকে ভাগাভাগি করে নিলাম। সেই সুবাদেই আমরা আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের নানান কথা বলে ফেললাম। ওর জীবনের কথাগুলো যখন ও বলছিল তখন আমার চোখ ভিজে উঠছিল। বুকের ভেতর থেকে শ্রদ্ধা ও ভক্তি আপনা থেকেই বাষ্প হয়ে চোখের জানালায় উকি দিচ্ছিল।

ও যখন খুব ছোট তখনই ওর বাবা-মার বিচ্ছেদ হয়ে যায়। তারপরই শুরু হয়ে যায় বেঁচে থাকার জন্যে ওর মা এবং আমার বন্ধু সহ তাঁর দুবোন মিলিয়ে মোট চারজনের কঠিন সংগ্রাম। এবং সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা আমান তাঁর দারিদ্র ও সংকটের দিনগুলোর কথা বলবার সময় এতটুকুও সংকোচ কিংবা লজ্জা বোধ করেননি। তাঁর মা ধার-কর্জ করে সব রকমের পরিশ্রমের কাজ করে তাঁদেরকে মানুষ করেছেন। তাঁদের গ্রামে তখন কেউ কাঠ পুরিয়ে রান্না করে থেত না, কিন্তু আমানের পরিবারকে কাঠ সংগ্রহ করে সেই কাঠ পুরিয়ে রান্না করে খেতে হয়েছে। কেবল তাই নয়, অর্থ কষ্টের জন্যে তাঁর দুবোনকে স্কুল পর্যন্ত ত্যাগ করতে হয়েছে। আরও আরও অনেক কষ্ট করে আমানকে এই পর্যন্ত আসতে হয়েছে। তাইতো প্রফেসর আমান নিজের কাছে সংকল্প করেছেন নিজের পরিবার ও তাঁর দেশের গরিব মানুষদের জন্যে সে জীবনের শেষ দিন অবধি নিরলস ভাবে কাজ করে যাবে। এই হলো তাঁর জীবন সংগ্রামের দৃশ্যপট। অথচ সে যখন নাচে, তখন কেবলই অভিভূত হতে হয়। আর যখন সে সংকল্পের কথা বলে তখন শুধু শ্রদ্ধাই করতে ইচ্ছে হয় ঐ ভিনদেশী স্বপ্ন পাগল মানুষটিকে।

আমরা দুজন মিলে গোটা দুনিয়ার চরম অশান্তির ও অমানবিকতার বিষয় নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করেছি এবং এই সব সমস্যা হতে উত্তরনের পথ খোঁজার চেষ্টা করেছি। আমান ঢাকা ও ঢাকার চারপাশ ঘুরতে যেয়ে ভীষণ ভাবে মর্মাহত হয়েছে। চারিদিকে কেবল নোংরা আর নোংরা এবং সবুজহীন অবস্থা। পলিথিনের মতো মারাত্মক বিষয় নিয়ে যথন কথা বলেছি তখন মরিয়া হয়ে উপায় খুঁজেছি এর থেকে বাঁচার, সেই সাথে ঢাকার লেক, নদী ও জলাশয় গুলোর বেহাল দশা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। তো ভাবনার শেষ পর্যায়ে এই সিদ্ধান্তে আসি যে, জোড়ালো ভিত্তিতে কাজ করে যেতে হবে আমাদেরকে পরিবেশ ও শিশুদের সুস্থ শিক্ষার বিকাশ নিয়ে। ওর দেশ মালয়শিয়ায় ১৯৯৭ সালের আগে পর্যন্ত এদেশের মত অবস্থা ছিল। কিন্তু ভালো চিন্তার মানুষের হাতে কত সুন্দর ভাবেই না বদলে গেছে ধ্বংসের মুখে থাকা একটি দেশ। মাহাথির মোহাম্মদের কথা সকলেই জানি আর এও জানি কত সুন্দর ভাবেই না তিনি তার দেশকে পরিচালিত করেছেন।

আমি ও আমরা কতকিছু নিয়েই না চিন্তিত হই, পত্রিকায় বুদ্ধিজীবিদের কলাম পড়ে যারপরনাই মুগ্ধ হই। অথচ সামগ্রিক ভাবে কাজ করিনা আমরা কেউই। আসুন না, আমাদের জন্যে, আমাদের ভিনদেশী বন্ধুদের জন্যে এই দেশকে এই ঢাকা শহরকে সুন্দর করে গড়ে তুলিজলকে বাঁচাই, পাখিকে বাঁচাই, মানুষকে বাঁচাই এবং বাঁচাই আমাদের স্বপ্নকে। আজ থেকে পলিথিন ব্যবহার বন্ধ করি। ময়লাগুলোকে ছড়িয়ে না রেখে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলি। গাছে গাছে ভরিয়ে তুলি এই ঢাকাকে। সবুজের শামিয়ানায়, সবুজের গালিচায় সাজিয়ে তুলি আমাদের শহরগুলোকে।

আমার মালয় বন্ধু কথা দিয়েছে, সে এই দেশের জন্যে কাজ করবে আমার সাথে। এবং আমি জানি সে তা করবে। তাঁর সেই হৃদয় আছে। কারন সে তাঁর অতীতকে এক মুহুর্তের জন্যেও ভোলে না।

আফসোস! আমার দেশের মানুষগুলোর জন্যে। ভাগ্যগুনে যদি একবার ভালো রকমের টাকার মুখ দেখে, তাহলে আর তাকেঁ পায় কে? ভুলে যায় তাঁর গরীব আত্মীয়কে, ভুলে যায় তাঁর অতীতকে। আর হ্যাঁ সমাজসেবা তো করেনই, মসজিদে রোজ চাঁদা দেন, হজ্ব করেন, মোটাতাজা গরু কোরবানী দেন দেশের বুকে ফেলে রাখেন শুধু কয়েকটি ছেঁড়া নোট আর উচ্ছিষ্ট গুলো।

আমি আমার মালয় বন্ধুর মতোন এই দেশে কিছু বাঙালী বন্ধু পেতে চাই, যারা নিজের পরিবার ও দেশের গরীব মানুষদের পাশে দাঁড়াবে। ভুলে যাবে সব উঁচু-নীচুর ভেদাভেদ। প্রফেসর আমান একটা কথা বলেছেন টাকা সবকিছু পারেনা। ভালো স্বপ্ন আর ভালো চিন্তাই সম্ভব করে তুলতে পারে সবকিছু। এই পৃথিবী অল্প দিনের জন্য আমাদের থাকতে দিয়েছে, তাই আমরা পৃথিবী থেকে মুছে যাবার আগেই পৃথিবীর বুকে ভালো কাজের ইতিহাস সৃষ্টি করি। আমার আপনার নাম কেউই মনে রাখবে না এমনকি আমাদের অতিপ্রিয় সন্তানেরাও না। যদি আমরা ভালো কাজ করি তবে তার মূল্য কখনোই হারিয়ে যাবে না।

অনেক অনেক ধন্যবাদ প্রফেসর আমান তোমাকে। তুমি আমার দেশেকে নিয়ে ভাবছো। এবং তোমার সুস্থ- পরিচ্ছন্ন দর্শন দিয়ে সবকিছুকে সুন্দর ও কল্যাণকর করে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছো। এমনকি তুমি তোমার আবেগ ও শ্রদ্ধা দিয়ে আমার ভাষাকেও শিখবার চেষ্টা করছো। সেজন্যে তোমার ভাষাতেই তোমায় বলবো তেরেমা কাসিহ্ (ধন্যবাদ)।


নিশ্চই তুমি আমার দেশে আবার আসবে এবং নিশ্চই আমরা স্বপ্নবান মানুষেরা মিলে তোমায় সুন্দর ঢাকা শহর দেখার সুযোগ করে দেবো।  

0 comments :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন